গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী মা এর রোজায় করনীয়

গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী মা এর রোজায় করনীয়

গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী মা এর রোজায় করনীয়
“গর্ভাবস্থা এবং রোজা” বিষয়টি অনুভূতিকাতর বিষয়। একজন মা এর ধর্মীয় অনুভূতির জায়গা। এই সময়ে একই সাথে মা তার শরীরে একটি প্রান বহন করছেন আবার ইচ্ছা পোষন করে থাকেন ধর্মীয় দায়িত্ব পালন করতে।। 

রোজা ধর্মপ্রান মুসলমানদের জন্য একটি অন্যতম ফরজ কাজ। তাই এই সময়ে অনেক গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী মা দ্বিধা দ্বন্দ্বে থাকেন যে সে রোজা রাখবেন কিনা।

রোজার রাখার ক্ষেত্রে একজন মা এর লক্ষনীয় বিষয় সমূহঃ
গর্ভবতী মা রোজা রাখতে পারবেন কিনা তা কিছু বিষয় পর্যালোচনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়া যায়- রোজায় গর্ভবতী মা রোজা থাকতে চাইলে কিছু বিষয় এর উপর লক্ষ্য রাখতে পারেন।

  • গর্ভবতী মা যদি তাঁর নিজের এবং গর্ভের সন্তানের কোনো সমস্যাবোধ না করেন তবে রোজা রাখতে পারেন। 
  • অনেক সময় না খেয়ে থাকার ফলে যদি গর্ভের সন্তানের নড়াচড়া কমে যায়, তাহলে মা রোজা না রাখতে পারেন
  • গরম না শীতকাল তা বিবেচনায় এনে মা রোজা রাখার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। কেননা অনেক সময় শরীর পানিশূন্য হয়ে যায়, ডিহাইড্রাইড হয়ে গেলে মা ও শিশু উভয়ের জন্য ক্ষতিকর।
  • পানি শূন্যতার লক্ষনঃ
    1. অনেক পিপাসা লাগা
    2. ক্লান্ত লাগা বা শরীরে শক্তি না থাকা
    3. মুখ, চোখ বা ঠোট শুকিয়ে যাওয়া।
    4. মাথা ব্যাথা করা
    5. গাঢ় বর্ণের প্রস্রাব হওয়া

যদি এসব লক্ষণ দেখা দেয় তবে মায়ের উচিত হবে পানি খেয়ে রোজা ভেঙ্গে ফেলা। এসময় স্যালাইন খেয়ে বিশ্রাম করতে হবে। যদি এর আধা ঘণ্টা পড়েও খারাপ লাগতে থাকে তবে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।

  • বমি, মাথা ব্যাথা, দুর্বলতা লাগলে মা বিবেচনা করে রোজা রাখবেন
  • যদি রোজা রাখতেই চান তবে সতর্ক থাকতে হবে। ডাক্তারের পরামর্শ /প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী চলতে হবে। রোজার আগে ডাক্তারের কাছ গিয়ে অবশ্যই চেকআপ করা জরুরি। 


সেহরিঃ

গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী মায়ের সেহরি হওয়া উচিত পুষ্টিকর।

  • গর্ভাবস্থায় যাঁরা রোজা রাখতে চান এবং যে সব মা দুধ খাওয়ান তাদের পুষ্টিবিদ এর পরামর্শ নেয়া উচিত।খাদ্যতালিকা অনুযায়ী খাবার খাবেন। ক্যালরি ও আঁশযুক্ত খাবারের দিকে বেশি খেয়াল রাখতে হবে। আঁশযুক্ত খাবার ধীর গতিতে পরিপাক হয় বলে ক্ষুধা কম লাগে। 
  • আঁশযুক্ত খাবার কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে।ইসবগুলের শরবত নিয়মিত খেলে কোষ্টকাঠিন্য অনেকাংশে এড়ানো যায়।
    1. 👉 আঁশ যুক্ত খাবার হল -কচুশাক, মিষ্টি আলুর শাক, কলমি শাক, পুদিনা পাতা, পুঁইশাক, মুলা শাক, ডাঁটা শাক, লাউ শাকে প্রচুর আঁশ রয়েছে।
    2. সবজি- অপেক্ষাকৃত বেশি আঁশযুক্ত সবজির মধ্যে রয়েছে সাজনা, কলার মোচা, ঢেঁড়স, ডাঁটা, বাঁধাকপি, ফুলকপি, ওলকপি, গাজর, শিম, পটল, কচু, বেগুন, বরবটি ও মটরশুঁটি।
    3. ফল- আঁশজাতীয় ফলের মধ্যে সবেচেয় বেশি আঁশ অংশ থাকে বেল, পেয়ারা, কদবেল, আমড়া, আতাফল, নারিকেল, কালোজামের মধ্যে। তা ছাড়াও গাব, কামরাঙ্গা, পাকা টমেটো, পাকা আম, পাকা কাঁঠাল, আপেল ও আমলকীর মধ্যে মাঝারি পরিমাণে আঁশ থাকে।
    4. ডাল- মটর, মুগ ও ছোলার ডালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আঁশ পাওয়া যায়। অন্যান্য- যব, ভুট্টা, আটা, তিল, কাঁচামরিচ ও সরিষাতেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে আঁশ অংশ বিদ্যমান।
  • সেহরির সময় যেসব খাবারে গ্যাস হয় বা বুক জ্বালা করে, ওই খাবারগুলো এড়িয়ে চলতে হবে। চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলুন। 
  • সেহরিতে বেশি খাওয়া যাবে না। কারন এতে মা এর বমির সমস্যা হতে পারে।। গর্ভবতী মা এর খেতে হবে অল্প করে।
  • ভিটামিনযুক্ত খাবার খেতে হবে।। অতিরিক্ত খাবার এর চেয়ে পুষ্টি ও মানসম্পন্ন খাবার খাওয়া উচিত।। 


ইফতারঃ

ইফতারের তালিকা হওয়া উচিত পুষ্টিকর।

  • ভাজা পোড়া নয় বরং পুষ্টিকর শরবত বা ডাবের পানি বা বিভিন্ন ফলের রস দিয়ে ইফতার শুরু হওয়া উচিত।
  • ইফতারের শুরুতে একত্রে সব না খেয়ে ধীরে ধীরে খাওয়া উচিত কেননা সারাদিন না খেয়ে থাকার ফলে পরিপাকতন্ত্রের ক্ষমতা ধীর গতির হয়ে যায়।। পানি বা অন্যান্য খাবার তাই দ্রুত না খেয়ে আস্তে-ধীরে খাওয়া উচিত। ইফতারের এক- দুই ঘন্টা পর অল্প অল্প করে খাওয়া উচিত।
  • প্রচুর পরিমাণে পানি পান করা উচিত। যেন পানিশূন্যতা বা লবনের পরিমান কমে না যায়। পানিশূন্যতা রোধ করতে ইফতার থেকে সেহরির মাঝামাঝি সময়ে পানির চাহিদা পূরন করা উচিত। মায়ের ইউনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন বা মুত্রনালীর কোন ইনফেকশন হয়ে থাকলে রোজা রাখতে বিশেষজ্ঞ ডঃ এর পরামর্শ নেয়া উচিত।
  • চিনিযুক্ত খাবার পরিহার করা উচিত। মা যদি ডায়াবেটিক মা হন তাহলে তো কথাই নেই। কেননা অধিক চিনিযুক্ত খাবার মা এর সুগারের মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে।।
  • সারাদিন পানি না খাওয়ার ফলে প্রস্রাবে হালকা জ্বালা হতে পারে। ইফতারের পর ঘন ঘন পানি খেয়ে তা পূরণ করতে হবে।


রাতের খাবারঃ

রোজায় মা এর রাতের খাবার হওয়া উচিত নির্দিষ্ট পরিমান। ইফতার আর রাতের খাবার ব্যালেন্স করে খেতে পারলে মা এর জন্য সহজ হবে রোজা রাখা।
ইফতার এর সময় সব একত্রে না খেয়ে উচিত রাতের খাবারের সাথে সমন্বয় করে খাওয়া। প্রোটিন ও এনার্জি দেয় এমন খাবার খাওয়া উচিত।
ইফতারের পর রাতের খাবারের আগে কিছুক্ষন বিশ্রাম নেয়া উচিত।। দুধ ও দুধের তৈরি খাবার রক্তশূন্যতা বা  অ্যানিমিয়ার প্রবণতা কমায়। দুধে গ্যাস হলে টক দই খেতে পারেন।

রোজা রাখার পূর্বে করনীয়ঃ

  • রোজা রাখার পূর্বে একজন মাকে অবশ্যই ডঃ এর পরামর্শ নিতে হবে।
  • ডায়াবেটিস থাকলে ওষুধের সময়সূচি নির্ধারণ করতে হবে।
  • অধিক বিশ্রাম নেয়া উচিত মা এর।
  • ঠান্ডা বা এসির মাঝে থাকা উচিত। 
  • বেশি সময় রোদে বা গরমে অবস্থান করবেন না। বাতাস বা খোলামেলা পরিবেশে থাকার চেষ্টা করুন।
  • ক্যাফেইন এড়িয়ে চলা উচিত।


রোজা রাখা উচিত নয় কাদেরঃ

  • ঝুঁকিপূর্ন গর্ভাধারন করেছেন বা হাই রিস্ক রোগী যারা তাদের রোজা রাখা উচিত নয়।
  • প্রি-একলেম্পসিয়া থাকলে বিশেষজ্ঞ ডঃ এর পরামর্শে রোজা রাখবেন।
  • অ্যানেমিয়া থাকলে রোজা রাখার ক্ষেত্রে ডক্টর এর পরামর্শ নিন।
  • ইনজেকশন বা অন্যান্য ট্রিটমেন্ট চললে রোজা রাখার ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ ডঃ এর পরামর্শ নিন।


দুগ্ধদানকারি মা এর রোজাঃ

  • মা কে অধিক পানি পান করতে হবে
  • জিংক,ম্যাগনেসিয়াম, ক্যালসিয়াম বা শরীর এর খনিজ লবম এর চাহিদা পূরন করতে হবে।
  • দুধ উৎপাদনের জন্য প্রচুর পানি পান করতে হবে।
  • বাচ্চার বয়স ৬ মাসের কম হলে এবং সে পুরোপুরি বুকের দুধ খেলেও রোজা রেখে বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ালে বাচ্চার ও মা এর কোন ক্ষতি হয়না কারণ আপনি রোজা রাখলেও আপনার শরীর আগের মতই দুধ উৎপন্ন করবে। 
  • রোজার কারণে শরীরে ক্যালোরির ঘাটতি হলেও তা বুকের দুধের পরিমাণের উপর কোন প্রভাব ফেলেনা। শিশুর বয়স এক বছরের বেশি হলে এবং সে অন্যান্য খাবারের সাথে সাথে দিনে মাত্র কয়েকবার বুকের দুধ খেলে রোজা রাখতে কোন সমস্যা হওয়ার কথা নয়। তারপরও মা যদি খারাপ বোধ বা অসুস্থ বোধ করেন তবে রোজা না রেখে পরবর্তীতে কাজা দিয়ে দিবেন।
  • উপরে গর্ভবতী মায়ের খাবার তালিকাগুলো আপনি অনুসরন করবেন।
  • ঘরের কাজকর্ম বা যে কোন ধরনের পরিশ্রমের কাজ সেহেরির আগে সেরে ফেলুন। দিনের বেলা যত বেশী সম্ভব বিশ্রাম নেয়ার চেষ্টা করুন। 


ধর্মীয় মতবাদঃ
গর্ভবতী ও দুগ্ধপোষ্য শিশুর মায়ের জন্য রোজা না রাখার অনুমতি আছে। তারা পরবর্তী সময়ে উক্ত রোজার কাযা আদায় করবে। কাফফারা দিতে হবে না। 

ইসলামী আলেমগন মনে করেন- গর্ভবতী মা রোযা রাখার কারনে গর্ভের সন্তান ও মায়ের ক্ষতি হয় আর দুগ্ধদানকারি মা এর ক্ষেত্রে যদি শিশু দুধ না পায়, সন্তান ক্ষুধায় কষ্ট পায় সে ক্ষেত্রে মা এর জন্য রমজান মাসের রোজা শিথিল করার বিধান আছে। যদি কোনো মা রোজা রেখে তার শিশুকে দুগ্ধ পান করালে অসুস্থ হয়ে পড়েন তাহলে তিনি রোজা এ সময় না রাখলেও পরে এগুলো কাজা রোজা দিতে পারবেন। 

“তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি অসুস্থ হবে অথবা পর্যায়ভুক্ত সফরে থাকবে সে অন্যদিনগুলোতে এ সংখ্যা পূর্ণ করবে” [সূরা বাকারা, আয়াত: ১৮৫] 

সূত্র:
ক. আল কোরআন: সূরা বাকারাহ: আয়াত ১৮৪
খ. সুনানে আবু দাউদ: রোজা না রাখার অনুমতি অধ্যায়, হযরত ইবনে আব্বাস রা. বণিত হাদিস।
গ.দারা কুতনী: সওম অধ্যায়, হযরত ইবনে আব্বাস বর্ণিত হাদীস। Zakat.org

রোজার ফিদইয়া :
রোজা রাখা দুঃসাধ্য হলে একটা রোজার পরিবর্তে একজন দরিদ্রকে খাদ্যদ্রব্য দান করা কর্তব্য।
অর্থাৎ গর্ভবতী বা দুগ্ধদানকারী মা কষ্টকর হলে রোজা না রেখে পরবর্তীতে আদায় করে নিবেন। আপনাদের জন্য আমাদের এই প্রচেষ্টা।
যদি ভাল লেগে থাকে অবশ্যই অন্য মায়ের সাথে শেয়ার করবেন।

কৃতজ্ঞতাঃ
nutrition.org.uk

আরও পড়ুনঃ
গর্ভাবতী মা এর অধিক গরম লাগার কারন ও করনীয়

গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী মা এর রোজায় করনীয়

গর্ভধারণে বিলম্বিত? কোন ভুল করছেন না তো?

গর্ভকালীন ডায়বেটিস এ মা এর করণীয়

গর্ভাবস্থায় কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে মুক্তি পেতে করনীয়

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on skype
Share on email

সম্পর্কিতপোস্ট

সম্পর্কিত পোস্ট

মন্তব্য করুন বা প্রশ্ন করুন ?

অনুসরণ করুন

Share via
error: Alert: PawkyThings.com এর লেখা ও ছবি কপি করা নিষেধ!
Send this to a friend